অসামাজিক কর্মকান্ড, মাদক ও জুয়ারীদের কারণে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা বিলুপ্তির পথে




নিউজ সময়, | প্রকাশিত: 06:14 PM, March 13, 2018
IMG


সাইফুল ইসলাম রুদ্র, নরসিংদী ঃ
বৃষ্টির মৌসুম ছাড়া বিশেষ করে শীতকাল এলেই আগে নরসিংদীর বিভিন্ন উপজেলাগুলোতে যাত্রাপালা শুরু হত। গ্রামগঞ্জে প্রায়ই মাইকে একটা সুর ভেসে আসতো হৈ হৈ কাণ্ড আর রৈ রৈ ব্যাপার যাত্রা যাত্রা যাত্রা। তার সাথে আরো যোগ করা হত “এক ঝাক ডানাকাটা পরীর দল এবং এরকম আরো কিছু কথা। সাধারণ মানুষ কর্মের ফাকে সাথে সাথে কান লেলিয়ে দিত পালা আর স্থানের নাম শোনার জন্য। কারণ সারাদিনের ক্লান্তি শেষে কিছুটা বিনোদন নিতে ছুটে যেতে হবে সেখানে। এই সময়টায় গ্রামের কৃষকেরা নতুন ফসল ঘরে তুলতো। সাথে সাথে পিঠা পায়েস নিজে খাওয়ার পাশাপাশি আত্মীয় স্বজনের বাড়িতেও দিত। অভাব কেটে যাওয়ায় বিনোদন হিসেবে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে যাত্রাদল ভাড়া করে এনে সুস্থ্য বিনোদন নিত। নরসিংদীর উপজেলাগুলোতে যেসব যাত্রাদল আসতো তার অধিকাংশ দলগুলো আসতো অন্যান্য জেলা থেকে। যাত্রাপালার মাইকিংয়ে শোনা যেত তার বিবরণ। জেলার সদর, রায়পুরা, শিবপুর, বেলাব, মনোহরদী, পলাশ উপজেলায় ৭১টি ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে এ যাত্রাপালার বেশ প্রচলন ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে গ্রাম বাংলার কৃষ্টিকালচারের অন্যতম যাত্রাপালা মানুষের কাছ থেকে সরে যেতে বসেছে। আগে কোনো অনুষ্ঠান হলে যাত্রাপালার কথা চলে আসতো। গ্রাম্য পরিবেশে কোনো মেলা বা পূজা পার্বন উপলক্ষে অথবা কোনো গ্রাম্য অনুষ্ঠানে যাত্রাপালা অবহমান কাল থেকে গ্রামের মানুষকে আনন্দ বিনোদন দিয়ে আসছে। তখন একমাত্র বড় বিনোদনের খোরাক ছিল এই যাত্রাপালা। মঞ্চে অভিনয় করতেন শিল্পীরা। তাকিয়ে থাকতো গ্রামের অতিসাধারণ দর্শক। সেই সময়ে নারী অভিনেত্রীর বড় অভাব ছিল। পুরুষদেরই নারীদের পোশাক পরিচ্ছেদ পড়িয়ে ডানাকাটা পরি বানিয়ে নারী চরিত্রে অভিনয় করানো হত। পেশাদার শিল্পীরাও মঞ্চ কাপিয়ে তুলতেন তাদের অভিনয় শৈলী দিয়ে। যাত্রা জগতে নাটোর এবং যশোহর ছাড়াও সাতক্ষীরার অনেক তারকার অভিনয় দেখার দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালার মতো ছুটে আসতেন দুর দুরান্ত থেকে। কিন্তু বর্তমানে কুড়িগ্রামের ৯টি উপজেলার কোনটিতেই আর যাত্রাপালার অনুমতি দেয়না পুলিশ প্রশাসন। বর্তমানে যাত্রাগানে অনুমতি না দেওয়ার পিছনে দুটি কারণ উল্লেখ করেছেন জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের আয়োজকরা। সে দুটি কারণ হচ্ছে, অশ্লীলতা আর যাত্রার নামে জুয়াখেলা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রায়পুরা উপজেলার চরআড়ালিয়া ইউনিয়নের এক যাত্রা আয়োজক জানিয়েছেন, ‘আগে আমরা যাত্রাগান চাদা তুলে পরিবারের সবাই মিলে উপভোগ করতাম। পরিবারের নারীরাই আমাদেরকে যাত্রাগান নিয়ে আসার জন্য তাগিদ দিত। এখন আর সেরকম যাত্রাগান দেখা যায় না। এখন যাত্রা মানে হচ্ছে অশ্লীল নাচ বা সারারাত ভরে অর্ধনগ্ন হয়ে মঞ্চে ঘোরাঘুরি করা। এছাড়া মদ্যপানসহ বিভিন্ন প্যান্ডেল নারীদের সাথে নোংরামীর খবরও আমরা পেয়েছিলাম। তখন আয়োজক হিসেবে নিজেকে যে কত ছোট মনে হয়েছিল তা ভাষায় বোঝাতে পারবো না।’ তিনি আরো বলেন, ৫০/৬০ দশকের যাত্রাপালা আর এখনকার যাত্রাপালার মধ্যে অনেক তফাৎ। তখনকার রাজমহল অপেরা, চৈতলী অপেরা, আনন্দ অপেরা, তিতাস অপেরা, পদ্মা অপেরা, নিউ দিপালী অপেরা, স্বদেশ অপেরা, নিউ বাসন্তী অপেরা, আদি রঙমহাল অপেরা, সুন্দরবন অপেরা, ভোলা নাথ যাত্রা সম্প্রদায়, ভাই ভাই অপেরা, পূজা অপেরা, গীতাশ্রী অপেরা, নিউ প্রভাষ অপেরা, বাবুল অপেরাসহ অনেক যাত্রা গোষ্ঠী আমাদের এলাকায় এসে মঞ্চ কাপিয়ে অভিনয় করেছেন। দর্শক শ্রোতাদের মন জয় করেছেন। তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে। তারা বলেন, মানুষের মধ্যে এখনো যাত্রা প্রেম আছে। আমরা শীতের এই সময়টাকে খুব অনুভব করি। কারণ এই শীতে যাত্রার কদর ছিল অনেক বেশি। কোন কোন পালাগুলো বেশী চলতো জানতে চাইলে, নবাব সিরাজউদ্দৌলাহ, মা মাটি মানুষ, দেবী সুলতানা, সুজন বাদিয়ার ঘাট, বধুর চিতা, কমলার বনবাস, কাশেম মালার প্রেম, বেদের মেয়ে জোসনা, ভিখারির ছেলে, গুনাইবিবি এবং রহিম- রুপবানসহ অনেক যাত্রাপালার নাম বলেন।

IMG IMG IMG

More From Category